
হার্ডওয়্যার বাজারে পেরেকের কেজি এখন ১২০ টাকা। দুই বছর আগে ছিল ৮০। তারের কেজি ১৪০, যা কখনো ১৬০ পর্যন্ত উঠেছিল, অথচ দুই বছর আগেও ছিল ১০০ টাকার নিচে। ডিসটেম্পারের গ্যালন ৫০০ থেকে ৭০০, ছয় মাস আগে ছিল ৪৫০ থেকে ৬০০। প্লাস্টিক পেইন্ট ১৩০০ থেকে ১৮০০, আগে ছিল ১১০০ থেকে ১৬০০। ইমালশন বা ওয়েদার কোটের গ্যালন ১৭০০ থেকে ২০০০, ১৮ লিটারের ড্রাম ৭৮০০ থেকে ১০০০০, যা আগে ছিল ৬০০০ থেকে ৯০০০। তারপিনের ৪ লিটার ১১০০ টাকা, ছয় মাস আগে ছিল ৯৬০। গত ছয় মাসে দুই দফা বেড়েছে রঙের দাম। সবশেষ রোববার মধ্যরাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অক্টোবরে আরও এক দফা বৃদ্ধির আভাস।
এই সংখ্যাগুলো একা কথা বলছে না। এগুলোর পেছনে যে রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করছে, সেটাই আসল ঘটনা।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাতের শাসনামলে এই দেশের নির্মাণ খাত, হার্ডওয়্যার ব্যবসা আর রঙের বাজার ঠিক এই একই অবস্থায় পড়েছিল।
তখনও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হতো, তখনও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেওয়া হতো, তখনও লোহার দামের রেফারেন্স টানা হতো। কিন্তু সেই পাঁচ বছরে এই খাতের ব্যবসায়ীরা কী পেয়েছিলেন? সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, আর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা একচেটিয়া বাজার। আজ ২০২৬ সালে এসে সেই একই কাঠামো ফিরে এসেছে।
যশোর হার্ডওয়্যার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মানিক চন্দ্র করের বক্তব্যে সেই সত্যটাই বেরিয়ে এসেছে। তিনি বলেছেন, বড় কোম্পানিগুলো দাম বাড়ালে সঙ্গে সঙ্গে অন্যরাও বাড়িয়ে দেন। এই "সঙ্গে সঙ্গে" শব্দটা কোনো সহজ ও স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া নয়। এটা সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের প্রমাণ। বার্জার, এশিয়ান পেইন্ট, এলিট, রক্সি, ডুলাক্স, সবাই একসাথে দাম বাড়াচ্ছে। কেউ পিছিয়ে নেই। প্রশ্ন হলো, এই সমন্বয় কে করছে? কে তাদের এই সংকেত দিচ্ছে যে এখন দাম বাড়ানোর সময় এসেছে? উত্তরটা রাজনৈতিক। যখনই বিএনপি-জামাতের শাসন আসে, তখনই এই সিন্ডিকেটগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০১-০৬ সালে আমরা এটা দেখেছি চাল, ডাল, তেল, চিনির বাজারে। আজ ২০২৬ সালে দেখছি রং, পেরেক, তার, তারপিনের বাজারে।
নিউ যশোর ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী অখিল রায় বলেছেন, রডের দাম বাড়লে পেরেক, তারের দাম বেড়ে যায়। আবার বিদেশ থেকে আসা পণ্যের দাম ডলারের ওপর নির্ভর করে। এই দুটি যুক্তিই বিএনপি-জামাতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মূল স্তম্ভ। একটি হলো অভ্যন্তরীণ কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা, অন্যটি হলো বৈদেশিক মুদ্রার ওপর। ২০০১-০৬ সালে তারা এই দুটি খাতেই ব্যর্থ হয়েছিল।
টাকার অবমূল্যায়ন, রিজার্ভের সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সব মিলিয়ে হার্ডওয়্যার ও রঙের বাজার ছিল চরম অস্থির। আজ ২০২৬ সালে এসে ঠিক সেই অবস্থায় ফিরেছে। অখিল রায় বলছেন, সব পণ্যের দাম গড়ে ২০ টাকা করে বেড়ে গেছে। এই ২০ টাকা কোনো সাধারণ মূল্যবৃদ্ধি নয়, এটা হলো বিএনপি-জামাতের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল্য।
যশোর শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক হার্ডওয়্যার ও রঙের দোকান রয়েছে। এর মধ্যে সমিতির সদস্য ১২০। এই ১২০টি দোকানের মালিক আজ শঙ্কায়। কারণ তারা জানেন, অক্টোবরে দাম আরও বাড়লে তাদের ক্রেতা কমবে, বিক্রি কমবে, আর শেষে দোকান বন্ধ করতে হবে। ২০০১-০৬ সালে ঠিক এভাবেই ছোট ব্যবসায়ীরা একের পর এক দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
বড় কোম্পানিগুলো টিকে ছিল, কারণ তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। আর ছোট ব্যবসায়ীরা প্রান্তিক হয়ে পড়েছিলেন। আজ ২০২৬ সালে সেই একই ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে যশোরের ১২০টি দোকানের মালিকের জন্য।
রংমিস্ত্রি মোহাম্মদ আলী বলছেন, বর্ষা চলে গেলে রঙের কাজ বেশি হয়, সামনেই সেই সিজন। কিন্তু জিনিসের দাম বেড়ে গেলে অনেকে কাজ করাতে চান না। এই যুক্তিটা সরাসরি নির্মাণ খাতের চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিএনপি-জামাতের শাসনে যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে, তখন গৃহস্থালি ও ব্যবসায়িক নির্মাণ কাজ কমে যায়। রং করার কাজ পিছিয়ে যায়, নতুন দোকান সাজানোর কাজ বন্ধ হয়, ঘর মেরামতের কাজ কমে। ফলে রংমিস্ত্রি থেকে হার্ডওয়্যার বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। ২০০১-০৬ সালে এই শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছিল। আজ ২০২৬ সালে আবারও ভাঙার পথে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে মধ্যরাতে। এই কৌশলটি নতুন নয়। ২০০১-০৬ সালেও বিএনপি-জামাত সরকার রাতের অন্ধকারে তেলের দাম বাড়িয়ে সকালে ঘোষণা দিত, যাতে মানুষের প্রতিবাদের সুযোগ না থাকে। আজ ২০২৬ সালে এসে ঠিক সেই কৌশল। মধ্যরাতে দাম বাড়াও, সকালে ঘোষণা দাও, আর সাধারণ মানুষকে বলো বৈশ্বিক পরিস্থিতি খারাপ। কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতি তো ২০০১-০৬ সালেও খারাপ ছিল। তখন তো তারা অজুহাত ছাড়াই দাম বাড়িয়ে দিত। আজ তারা অন্তত অজুহাত দিচ্ছে, এটাই কি তাদের রাজনৈতিক পরিণতির প্রমাণ? না, এটা তাদের সেই পুরনো মুখোশের নতুন রূপ। অজুহাত বদলেছে, ক্ষমতার কাঠামো বদলায়নি।
হার্ডওয়্যার পণ্যের মধ্যে দরজার কবজা, ছিটকিনি, হ্যাজবোল্ট, সবকিছুর দাম বেড়েছে। এই পণ্যগুলো সরাসরি নির্মাণ খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। যখন নির্মাণ খাত ধীর হয়ে যায়, তখন এই পণ্যগুলোর চাহিদা কমে, বিক্রি কমে, দোকানদারদের মুনাফা কমে। ২০০১-০৬ সালে এই দৃশ্য ছিল সাধারণ। আজ ২০২৬ সালে সেটাই অসাধারণ হয়ে উঠেছে। কারণ মানুষ ভেবেছিল সেই দিন আর ফিরবে না। কিন্তু ফিরে এসেছে। বিএনপি-জামাতের শাসন মানেই এই বাস্তবতা।
২০০১-০৬ সালে এই দেশের মানুষ কী পেয়েছিল? জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়া, ব্যবসায়ীদের মুখে শুধু একটি কথা, দাম বেড়েছে কী করব। আজ ২০২৬ সালে এসে ঠিক সেই চিত্র। রঙের গ্যালন ৫০০ থেকে ৭০০, তারপিন ৯৬০ থেকে ১১০০, পেরেক ৮০ থেকে ১২০। এই সংখ্যাগুলো শুধু সংখ্যা নয়, এগুলো হলো বিএনপি-জামাতের অর্থনৈতিক দর্শনের জীবন্ত সাক্ষী।
যে দর্শন বলে বাজারকে অস্থির করতে দাও, সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দাও, আর জনগণকে বলো বৈশ্বিক পরিস্থিতি খারাপ। সেই দর্শন আবার ফিরে এসেছে ২০২৬ সালে। যশোরের হার্ডওয়্যার বাজারের ১২০টি দোকান আর রংমিস্ত্রি মোহাম্মদ আলী এর জীবন্ত প্রমাণ।